বাংলাদেশে হোমিওপ্যাথির একটা ভালো কদর আছে। দেশে একটা হোমিওপ্যাথি শিক্ষার জন্য কলেজও রয়েছে। সস্তা এবং বিকল্প ধারার চিকিৎসা হিসেবে জীবনের কোনো না কোনো সময় দেশে একটা বিশাল জনগোষ্ঠী হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকের দ্বারগ্রস্ত হন। কেউ বলেন প্রতিক্রিয়া বিহীনভাবে রোগ সারাতে হোমিওপ্যাথি ঔষধের তুলনা নেই। কেউ বলেন যে ঔষধের ক্রিয়া নেই, সেই ঔষধের প্রতিক্রিয়াও নেই; হোমিওপ্যাথি নিতান্তই ভুয়া একটি চিকিৎসা।আসুন জেনে নেই আসলেই কি? ঔষধ নাকি চিনিপানি? রোগ সারায় নাকি প্রতারণা।

জেমস র‍্যান্ডি  হোমিওপ্যাথি

পেশাজীবী সন্দেহবাদি জেমস র‍্যান্ডি প্রায়ই তার পাবলিক বক্তব্যের আগে ওষুধ খেতেন। পরে তিনি জানাতেন এই মাত্র তিনি হোমিওপ্যাথিক ঘুমের বড়ির ৬ মাসের কোর্স একবারে গিলে ফেললেন। বক্তব্যের শেষে তিনি দিব্যি হেঁটে বেরিয়ে গেলেন, ঘুমালেন না! আরেকবার তিনি কংগ্রেসে গেলেন একই ওষুধ খেয়ে, কাজ হলো না- র‍্যান্ডি ব্যঙ্গাত্মকভাবে জানান- “কংগ্রেসের মিটিং আর হোমিওপ্যাথির ঘুমের ওষুধ মিলেও আমাকে ঘুম পাড়াতে পারলো না…আমার মনে হয় কিছুই আমাকে ঘুম পাড়াতে পারবে না।”

জেমস র‍্যান্ডির একটা চ্যালেঞ্জ ছিল- অতিপ্রাকৃত প্রমাণে ১ মিলিয়ন ডলার পুরষ্কার। সেটাতে তিনি হোমিওপ্যাথিকেও সুযোগ দিয়েছিলেন অংশ নেয়ার। কয়েকজন হোমিওপ্যাথ অংশ নিলেও তাদের বিদ্যার কার্যকারিতা প্রমাণ করতে পারেননি। আর বড় বড় হোমিওপ্যাথরা সেটাতে অংশই নেননি। ভেবে দেখুন তো, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সন্দেহবাদির কাছে গিয়ে নিজেদের ওষুধের প্রমাণ দেয়াটা কতবড় পাবলিসিটি হতে পারতো তাদের জন্য। তারপরও গেলেন না। কারণটা কী হতে পারে?

১৭০০ শতকের যাদু টোনা এবং প্রচলিত কুচিকিৎসার বিরুদ্ধে হোমিওপ্যাথির উদ্ভব হলেও এর মূলনীতি তৈরী হয়েছে কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ছাড়া।

হোমিওপ্যাথির দুটো মূলনীতি হচ্ছে একই ধরণের পদার্থের সুত্র এবং লঘুকরণের সুত্র। একই ধরণের পদার্থের সুত্র অনুযায়ী, যে পদার্থের উপস্থিতিতে একটি রোগের সুত্রপাত হয়েছে, সেই পদার্থের খুব অল্প পরিমান সেবনে সেই রোগটিকে সেরে যাবে। লঘুকরণের সুত্র অনুযায়ী, ঔষধের মাত্রা যত কম হবে তার প্রভাব তত বেশী হবে। অথচ বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমানিত হয়েছে যে ঔষধের মাত্রা বাড়ার সাথে সাথে তার প্রভাব বাড়বে। প্রথম সুত্রটিরও বিজ্ঞান সম্মত কোনো প্রমান নেই।

টোটকা বানাবার জন্য হোমিওপ্যাথেরা প্রথমে বিভিন্ন ধরণের পদার্থ সেবন করেন। একটি পদার্থ যে উপসর্গের জন্ম দেয়, সেই উপসর্গের রোগ সারাতে হোমিওপ্যাথির নিয়ম অনুযায়ী পদার্থটির লঘুকৃত দ্রবণ সেবন করতে হবে। লঘুকরণের সুত্র অনুযায়ী হোমিওপ্যাথিক টোটকাগুলোকে অস্বাভাবিক রকমের পাতলা করা হয়। ৩০X টোটকা তৈরী করতে এক ফোঁটা মূল উপাদান ৫০ পৃথিবীর সমান পরিমান পানিতে গোলানোর সমতুল্য পরিমানে লঘু করা হয়। অথচ রসায়নের সুত্র অনুযায়ী এতে মূল পদার্থটির একটি অনুও থাকার কথা নয়।

উপরন্তু বিভিন্ন গবেষনায় বার বার প্রমানিত হয়েছে যে হোমিওপ্যাথি কোনো রোগ সারায় না। তারপরও আধুনিক চিকিৎসার অপ্রতুলতা, স্বল্প খরচ এবং নিয়ন্ত্রনের অভাবে বাংলাদেশের মত গরীব দেশে হোমিওপ্যাথি ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়েছে। এর ফলাফল হিসেবে অনেক ক্ষেত্রে গুরুতর রোগের অপচিকিৎসা হচ্ছে এবং হোমিওপ্যাথির পিছনে লোকে অযথা খরচ করছে।

ইতিহাস এবং মূলনীতি: গোঁড়ায় গলদ দিয়ে শুরু।

হোমিওপ্যাথি সম্পর্কে প্রাথমিক কিছু কথা বলে নেয়া যাক। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা পদ্ধতির আবিষ্কারক জনাব স্যামুয়েল হ্যানিম্যান। জার্মানির এই ভদ্রলোকের উদ্দেশ্য ছিলো মহৎ। সেই সময় চিকিৎসা ব্যবস্থার অবস্থা ছিলো ভয়াবহ। তখন বিশ্বাস  করা হত, চার প্রকার তরল (কালো, হলুদ, রক্ত এবং কফ) এর তারতম্যই যত রোগের কারণ। এই অদ্ভুত তথ্য অনুসারে অদ্ভুত সব চিকিৎসা করা হত।  হ্যানিম্যানের এই অবস্থা ভালো লাগে নি। তিনি ভালো কোন চিকিৎসা পদ্ধতি বের করতে চেয়েছিলেন। এ করতে গিয়ে একদিন তিনি সিনকোনা গাছের রস খেয়ে ফেললেন। এতে করে তার কম্প দিয়ে জ্বর এলো। যা অনেকটা ম্যালেরিরা রোগের উপসর্গের মত। তখন তার মাথায় বুদ্ধি এলো। যা দিয়ে রোগের উৎপত্তি, তা দিয়েই রোগ নিরাময় সম্ভব। তিনি সবাইকেই সিনকোনা পাতার রস খাইয়ে দিলেন, দেখলেন সবারই কম্প দিয়ে জ্বর আসছে। এরপর তিনি রোগ সারানোর জন্যে করলেন কী, অতি অল্প মাত্রায় সিনকোনা পাতার রস খাইয়ে দিতে লাগলেন পানি অথবা এ্যালকোহলের সাথে দ্রবীভূত করে। তিনি কোত্থেকে যেন কিছু প্রকল্প (হাইপোথিসিস) বানিয়ে ফেললেন, যার কোন ভিত্তি এখনও পাওয়া যায় নি।

হোমিওপ্যাথিক চালাকি ৪ টি চালাকি !

চালাকি ১|

হানেম্যান বলেন যে শরীরে যে দ্রব্যের কারণে রোগ সৃষ্টি হয় সেই দ্রব্য দিয়েই সে রোগের চিকিৎসা সম্ভব। যেমন- এলার্জির জন্য দায়ী দ্রব্য দিয়ে শরীরের humour এর মাত্রাকে প্রভাবিত করে এলার্জিরই চিকিৎসা সম্ভব। এর নাম তিনি দেন “similia similibus curentur” বা the law of similar।

তবে, সন্দেহবাদিরা প্রশ্ন তুলতে লাগলেন আসলেও হানেম্যানের চিকিৎসা “চিকিৎসা” কী না সেটা নিয়ে। রোগের জন্য দায়ী দ্রব্য দিয়ে আবার সেই রোগের চিকিৎসা হয় নাকি? প্রশ্নটা যৌক্তিক।

চালাকি ২|

হানেম্যানও জানতেন এটা, তাই তিনি উদ্ভাবন করেন law of infinitesimal। যেখানে তিনি বলেন দ্রব্যটাকে যদি অ্যালকোহল বা পানিতে দ্রবীভূত করা হয় তবে তার রোগসৃষ্টির ক্ষমতা কমে যায়, আর শরীর সেটাকে গ্রহণ করে নিজের চিকিৎসা নিজেই করে। তর্কের খাতিরে কথাটা হয়তো মেনে নেয়া যেত, কারণ শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা মারাত্মক রকমের হয়। তবে হানেম্যান বললেন- যে ওষুধ যত বেশী লঘুকৃত (diluted) তার ক্ষমতা তত বেশী। হ্যাইনম্যানের ওষুধগুলো সাধারণত ১০^৩০ ভাগের ১ ভাগ ওষুধ থাকে আর বাকি সব দ্রাবক। অন্যভাবে বলতে গেলে পৃথিবীর সকল মরুভূমি আর সমুদ্রসৈকতের সকল বালুকণার মাঝে ১টি বালুকণা হচ্ছে ওষুধের দ্রব্য, বাকিগুলো দ্রাবক!

 

চালাকি ৩|

স্যামুয়েল হানেম্যান খুব চালাকি করে তিনি একটি শব্দ উদ্ভাবন করেন- অ্যালোপ্যাথি। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের সকল সফলতা, প্রমাণলব্ধ সকল ওষুধ, কার্যকরী সকল থেরাপী, internal medicine, oncology, neurology, cardiology, psychiatry, pathology, surgery, infectious disease, hematology, geriatrics, gastroenterology, ophthalmology, radiology, orthopedics, nephrology, urology, pharmacology, emergency medicine and critical care সব কিছু অ্যালোপ্যাথি, এক শব্দে প্রকাশিত। সুতরাং হোমিওপ্যাথি যেমন ওষুধ অ্যালোপ্যাথিও তেমনি! ২০০ বছর আগে একজনের বলা চিকিৎসা ব্যবস্থা আর তখন থেকে হাজার হাজার গবেষকের হাজার হাজার ঘণ্টার গবেষণার ফলাফল একই সমান বলে বিবেচনা করা বোকামি ছাড়া আর কিছু না।  নতুন ফলাফলের সাথে জ্ঞানের পরিবর্তন আধুনিক বিজ্ঞানের মূল ভিত্তি, আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানও।

এরপরও মানুষ বোকা বনছে, কারণ তাদের সামনে হোমিওপ্যাথিকে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের সমান করে উপস্থাপন করা হয়েছে, ওদের সামনে দুইটা পথ তুলে ধরা হয়েছে, যদিও হোমিওপ্যাথির পথটা কোনো পথই না। খোদ ব্রিটেনের রাজ পরিবারে একজন নির্দিষ্ট হোমিওপ্যাথিক “ডাক্তার” আছেন।

হোমিওপ্যাথি আসলেও কী কাজ করেএবং আরো একটি চালাকি

হোমিওপ্যাথির কার্যকারিতা নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে, আর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কাঙ্খিত ফলাফলই এসেছে- যে হোমিওপ্যাথি কাজ করে না- আর যেসব ক্ষেত্রে কাজ করে সেগুলোকে প্লাসিবো ইফেক্ট বলে ধরে নেয়া যায়। তবে কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে হোমিওপ্যাথির কার্যকারিতা প্লাসিবোর চেয়েও বেশী। তবে সে সব গবেষণা নিয়ে প্রশ্ন আছে National Institutes of Health এর মতে- “পরীক্ষণগুলোর ডিজাইনে দূর্বলতা ছিল, রিপোর্টিংয়েও। পরিমাপের একক নির্ধারণে সমস্যা ছিল, অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা অপ্রতুল ছিল, আর একই ফলাফল বারবার পাওয়া যাচ্ছিল না।”

British Medical Journal এর ১৯৯১ সালে প্রকাশিত ২৫ বছর ধরে করা গবেষণায় ১০৭টি কনট্রোল পরীক্ষণের হোমিওপ্যাথির পক্ষে ফলাফল পাওয়া যায়। হোমিওপ্যাথরা এই ব্যাপারটিকে অনেক বড় করে প্রচার করেন। তবে একই গবেষণার উপসংহারে বলা হয়েছে “At the moment the evidence of clinical trials is positive but not sufficient to draw definitive conclusions because most of the trials are of low methodological quality and because of the unknown role of publication bias.” অর্থাৎ, সেই সময়ে প্রাপ্ত গবেষণার ফলাফল থেকে এই উপসংহারে যাওয়া যায় না যে হোমিওপ্যাথি কার্যকর, পরীক্ষণগুলো নিম্নমানের জন্য। “Publication bias” বলতে বুঝানো হয়েছে যে অসমাপ্ত গবেষণার ফলাফলকে হোমিওপ্যাথরা প্রকাশ করে নিজেদের পক্ষে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করছেন। ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল আরো জানায় যে- এ থেকে ভবিষ্যৎ গবেষণার তাগিদ পাওয়া যায়, আর আরো উন্নত মানের পরীক্ষণের মাধ্যমে ফলাফল বের করা সম্ভব।

তবে ব্রিটিশ হোমিওপ্যাথরা সোজা বলে দিয়েছে- নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষণ দিয়ে হোমিওপ্যাথির কার্যকারিতা গবেষণা করা সম্ভব না। মানে এটা পরীক্ষার উর্ধ্বে। মানে হোমিওপ্যাথিকে প্রশ্ন করা যাবে না। হোমিওপ্যাথিকে প্রশ্ন করা নিষিদ্ধ ব্যাপার। কোনো কিছুর সাথে মিল পাচ্ছেন?

 

এসবের জবাবে হোমিওপ্যাথরা আটকে রইলো সেই লঘুকরণ, আর পানির স্মৃতি গল্পেই। আর  বলতে লাগলো সব দোষএ্যালোপ্যাথি

হোমিওপ্যাথির পতন শুরু হয় আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রসারের সাথে সাথে। আবিষ্কৃত হয় এন্টিবায়েটিক, জার্ম থিওরি, বিস্তৃত হয় পড়াশোনার ক্ষেত্র। হোমিওপ্যাথরা আটকে রইলো সেই লঘুকরণ, আর পানির স্মৃতি গল্পেই। তারা ফিজিওলজি, এ্যানাটমি, প্যাথোলজি পড়েন নামেমাত্র। তাদের কাছে মেটিরিয়া মেডিকা, আর অর্গানন অফ মেডিসিনেই আছে সব প্রশ্নের উত্তর। আধুনিক চিকিৎসাকে হোমিওপ্যাথরা মূলত তখন থেকেই এ্যালোপ্যাথি নামে বলা শুরু করলো। হ্যানিম্যান অনেক আগেই এই শব্দটা বলে গেছেন, তবে তখন আধুনিক চিকিৎসা বলে তেমন কিছুই ছিলো না। হোমিওপ্যাথিই তখন আধুনিক চিকিৎসা। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান নতুন নতুন সব গবেষণা, আর ঔষধে সমৃদ্ধ হতে লাগলো, একে একে ইউরোপের সব হোমিও কলেজগুলি বন্ধ হয়ে যেতে থাকলো। তখন তারা আবিষ্কার করলো ষড়যন্ত্র তত্ত্ব! “এ্যালোপ্যাথিক ডাক্তার”রা নাকি ঔষধ কোম্পানির সাথে চুক্তি করে হোমিওপ্যাথিকে দাবিয়ে রাখতে শুরু করেছে। যেহেতু হোমিও ঔষধের দাম কম, আর ‘এ্যালোপেথি’ ঔষধের দাম বেশি, তাই এতে কোম্পানি এবং ডাক্তার, সবারই বেশি লাভ। এজন্যেই বেচারা হোমিওপ্যাথি উঠতে পারছে না!

আপনি প্রত্যেক হোমিওপ্যাথ ডাক্তারের কাছে একই বয়ান শুনবেন। আমি একাধিকবার শুনেছি। এই কালকেই তো শুনলাম একজন পাস করা হোমিও ডাক্তারের কাছ থেকে! তিনি মার্কেট ইকোনমি নামক একটি শব্দ ব্যবহার করলেন অতি আবেগের সাথে। এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে, একটা প্রোডাক্টের দাম নির্ধারিত হয় কনজিউমারের চাহিদার ভিত্তিতে। আপনারা ২৩০ বছরেও হোমিওপ্যাথির যথার্থতা প্রমাণ করতে পারেন নি কেন? যদি চাহিদা তৈরি করতে পারতেন, যদি যথার্থতা প্রমাণিত হত, যদি গোঁজামিল না দিতেন, তাহলে হোমিও ঔষধের দাম বেশি হতো, আর ‘এ্যালোপ্যাথি’র দাম কম হত, ঠিক না?

হোমিওপ্যাথির ব্যবসা নেই একদম, তা অবশ্য ঠিক না! ইউরোপের দেশগুলিতে গ্রহণযোগ্যতা কমছে দিনদিন, কিন্তু ভারত, বাংলাদেশের মত দেশে বিস্তার লাভ করছে। কেন বিস্তার হচ্ছে, সে প্রশ্নে পরে আসি। এখন আধুনিক বিশ্বে হোমিওপ্যাথির বর্তমান অবস্থাটা একটু দেখাই! যারা হোমিওপ্যাথিতে বিশ্বাসী, তারা এগুলোকে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখে নিয়েন, আরে এক ড্রপ বেলেডোনা খেয়ে নিয়েন। মানসিক অশান্তি দূর হবে।

 

তারা এগুলোকে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখে : ষড়যন্ত্র

যুক্তরাজ্যে National Health Service (NHS) ২০১৭ এর জুলাইয়ে এক রিপোর্ট প্রকাশ করে। সেখানে হোমিওপ্যাথিকে অকার্যকর হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়। রিপোর্টের চুম্বক অংশ এখানে দিচ্ছি- “The Australian NHMRC concluded that homeopathy should not be used to treat health conditions that arechronic, serious, or could become serious. People who choose homeopathy may put their health at risk if they reject or delay treatments for which there is good evidence for safety and effectiveness”.

আরো- “The UK Science and Technology Committee report into homeopathy in 2010concluded that the systematic reviews and meta-analyses conclusively demonstrate that homeopathic products perform no better than placebos.”

পুরোটা পড়ুন এখান থেকে

ষড়যন্ত্র

(তারা এগুলোকে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখে)

The Royal London Hospital for Integrated Medicine ২০১৮ সালের এপ্রিল থেকে National Health Service (NHS) এ হোমিওপ্যাথি ঔষধের গবেষণার জন্যে ফান্ডিং বন্ধ করে দিয়েছে। লিংক- https://www.bbc.com/news/health-43373817

 

ষড়যন্ত্র

অস্ট্রেলিয়ায় প্রাইভেট হেলথ ইনসুরেন্সের নতুন নীতিমালা অনুযায়ী ১ এপ্রিল ২০১৯ তারিখ থেকে ইনসুরেন্স কভারেজের আওতায় হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা আর থাকছে না। তাদের ভাষায়- “From 1 April 2019 the following natural therapies will be excluded from the definition of private health insurance general treatment and will no longer receive the private health insurance rebate as part of a general treatment policy: Alexander technique, aromatherapy, Bowen therapy, Buteyko, Feldenkrais, Western herbalism, HOMEOPATHY, iridology, kinesiology, naturopathy, Pilates, reflexology, Rolfing, shiatsu, tai chi, and yoga”. হোমিওপ্যাথি নামটা ক্যাপিটাল লেটারে দিলাম, যেন দেখতে সুবিধা হয়। কেন তারা এটা করেছে?

“Why is this important?

A review chaired by the former Commonwealth Chief Medical Officer found there is no clear evidence demonstrating the efficacy of the excluded natural therapies.”

দেখলেন, কমনওয়েলথের প্রাক্তন চিফ মেডিকেল অফিসারও ষড়যন্ত্র করে। কত্ত খারাপ!

লিংক- http://tinyurl.com/yxa2cym2

ষড়যন্ত্র

আমেরিকার  Federal Trade Commission সাফ বলে দিয়েছে, হোমিওপ্যাথি ঔষধের গায়ে Unscientific লেবেল থাকতে হবে। বিস্তারিত-https://slate.com/technology/2016/11/the-ftcs-new-homeopathic-medicine-rules-will-backfire.html

আর কত দেখতে চান? যত দেখতে চান, তত দেখাতে পারবো। ভালো হয়, নিজে একটু ঘেঁটে দেখলে।

ষড়যন্ত্র

উইকিপিডিয়ায় অপবিজ্ঞান বা Pseudoscience এর যে তালিকা করা হয়েছে, তাতে হোমিওপ্যাথি  সগর্বে বিদ্যমান!

হোমিওপ্যাথির পক্ষে বাংলাদেশে প্রচলিত কয়েকটিযুক্তি ও  জবাব

হোমিওপ্যাথির কোনো সাইড এফেক্ট নেই
হোমিওপ্যাথি টোটকাগুলো প্লাসিবো একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে এই টোটকাগুলো কোনো রোগ সারায় না। সুতরাং যার কোনো এফেক্ট নেই তার সাইড এফেক্ট না থাকাই স্বাভাবিক।

 “ভেষজ বা প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরী
কিছু কিছু হোমিও টোটকা ভেষজ উপদান থেকে প্রস্তুত ঠিকই। কিন্তু Oscillococcinum নামের একটি টোটকা তৈরী হয় হাঁসের যকৃত থেকে, এক বিষাক্ত মাকড়সার নির্যাস দিয়ে প্রস্তুত করা হয় মাল্টিপল স্কোলেরোসিস নামের এক মস্তিষ্ক এবং শিড়দাঁড়ার রোগের টোটকা, কোবরার বিষ দিয়ে প্রস্তুত করা হয় ক্যান্সারের টোটকা। প্রাকৃতিক উপাদানের নাম যদি এগুলো সেবন করতে হয় তাহলে আপনি প্রস্তুত তো? হোমিওপ্যাথির তেমন কোনো সর্বজনগৃহীত স্ট্যান্ডার্ড নেই, এটা কোনো মান নিয়ন্ত্রন পদ্ধিতের মধ্যে দিয়েও যেতে হয় না। তাই ভেষজ আর প্রাকৃতিক উপাদানের নামে আসলে কি দেয়া হচ্ছে আপনারে সেটা জেনে রাখাই ভালো।

অমূকের রোগ সেরে গেছে বা আমার ক্ষেত্রে কাজ করেছে
প্লাসিবো বা নকল ঔষধের ধর্মটাই এরকম। মানুষের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক শক্তিশালী। তাই অনেক ক্ষেত্রে এই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিজেই রোগ সারিয়ে নিতে পারে। নকল ঔষধ শুধু ভরসাটুকু দেয়। কিন্তু ক্রমাগত পরীক্ষার পর পরীক্ষা করে দেখা গেছে আসলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যতটুক রোগ সারায় হোমিওপ্যাথি তার চেয়ে ভালো কিছু ফলাফল তৈরী করতে পারেনি।

 

কোনো ক্ষতি তো হচ্ছে না! বা কিছুদিন চেষ্টা করেই দেখি…”
ক্ষতির কারণগুলো আমি লেখার  বাঙ্গালীর ঘাড়ে হোমিওপ্যাথির ভুত চেপে বসা অংশে তুলে ধরেছি। ক্যান্সার, অটিজম, মাল্টিপল স্কোলেরিসিস ইত্যাদি রোগ গুলোর জন্য সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হোমিওপ্যাথির উপর নির্ভর করে কালক্ষেপন কেবল বিপদ বয়ে নিয়ে আসবে। তাছাড়া টাকা পয়সা খরচের ব্যাপার তো আছেই।

আমেরিকা থেকে ঔষধ তৈরী হয়, তারা তো ঠিকই এটা ব্যবহার করে
খোদ আমেরিকাতেই ভীষণ বাঁধার মুখে আছে হোমিওপ্যাথি। কিছু লোকের বিশাল ব্যবসা বন্ধ হবে বলে তারা জিইয়ে রেখেছে এই প্রতিষ্ঠানগুলো। আর আমেরিকার ভালো বিষয়গুলো গ্রহণ না করে আমাদের কেনো এই খারাপ জিনিসটি গ্রহণ করতে হবে সেটা আমার বোধগম্য নয়।

 

হোমিওপ্যাথিতে সমস্যা কী?

অনেকে হয়ত ভাবতে পারেন হোমিওপ্যাথিতে সমস্যা কী? কাউকে তো জোর করে ওষুধ খাওয়ানো হচ্ছে না, বা যদি সেটা কোনো ওষুধই না হয়ে থাকে তবে তার কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও তো নেই। সমস্যাটা নৈতিক। একজন অসুস্থ ব্যক্তিকে ওষুধের নামে পানি/অ্যালকোহল বা চিনির বড়ি খাইয়ে টাকা নেয়া প্রতারণা। অনেক ক্ষেত্রে প্লাসিবো কাজ করে, অনেক ক্ষেত্রে করে না। যে ক্ষেত্রে করে না সে রোগীদের কষ্ট লাঘবের অন্য ব্যবস্থা থাকা স্বত্ত্বেও হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা নেয়াটা নৈতিকভাবে ভুল। হোমিওপ্যাথি অপবিজ্ঞান, যে কোনো অপবিজ্ঞানেরই অনেক ভক্ত থাকেন, যারা খুব নিশ্চিত যে তাদের জানা জ্ঞানই ঠিক, বাকিদের সকল জ্ঞান-বিজ্ঞান-পরীক্ষা-গবেষণা ভুল।

.

এক শ্রেণীর মানুষ আছেন যারা মনে করেন প্রভাবশালী সকল দেশের রাষ্ট্রনায়কেরা রূপ-বদলাতে পারা গিরিগিটিদের প্রতিনিধি। তাদের সাথে কথা বলে বুঝানোর চেষ্টা করলে ওরা আপনাকে বলবে ব্রেইনওয়াশড- সিস্টেমের গোলাম। হোমিওপ্যাথির ক্ষেত্রেও প্রায় এমনটাই হয়। যারাই হোমিওপ্যাথিকে প্রশ্ন করবে তারাই হোমিওপ্যাথির উন্নতির বিপক্ষে বা ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানীর টাকা খাওয়া লোক বলে দাবী করা হয়। প্রামাণ্যতা না, পক্ষ-বিপক্ষ বিবেচনা করে যদি ওষুধের কার্যকারিতা মাপতে হয় তবে সেটা কতটুকু ওষুধ তা ভাবার বিষয়। ওষুধের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে যদি সুফল লাভ করতে হয়, তবে কী চলে?

 

প্রিয়জনের অসুখের সময় যুক্তিতর্ক থেকে বেরিয়ে এসে সবরকম চেষ্টা মানুষ কেনো করে সেটা আমি বুঝি। এর উর্ধ্বে আমিও বোধহয় উঠতে পারবো না। তবে সেক্ষেত্রে হোমিওপ্যাথি যদি সেবন করেও থাকেন, মূল ধারার ঔষধ ছেড়ে দিয়েন না।

লেখাটির তথ্যসুত্র সুংযুক্তের কাজ চলমান। ..