একটি বাচ্চা সুস্থ সবলভাবে জন্মগ্রহন করবে কিনা সেটা নির্ভর করে মায়ের জীবনযাত্রার উপর। তাই গর্ভাবস্থায় কোন কাজটি করা যাবে, আর কোনটি যাবেনা সেটি আজ ৯টি পয়েন্টে ব্যাখ্যা করবো।

১. খাবারঃ
শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশে একজন গর্ভবতী নারীকে প্রোটিন, মিনারেল, ভিটামিন, ক্যালসিয়াম, আয়রণ ও আয়োডিনযুক্ত খাবার খেতে হবে। যেটা কিনা মৌসুমী ফল, টাটকা শাকসবজি, ডাল, বাদাম, মাছ, মাংস, ডিম ও পাস্তরিত দুধে পাওয়া যায়। তাই ভাত কম খেয়ে এসব খাবার বেশি বেশি করে খেতে হবে। এছাড়া দিনে ৮-১০ গ্লাস পানি খাওয়াও বেশ জরুরী। তবে হ্যাঁ, ফল-সবজিগুলো ভালোভাবে ধুয়ে তারপর খাবেন। মাছ, মাংস, ডিম যেটাই খান না কেন পুরোপুরি সেদ্ধ করে খাবেন। কাঁচা আধাসেদ্ধ খাবার, বাসি বা ভেজাল মেশানো খাবার, টেস্টিং সল্ট, পাস্তরিত দই, পনির, প্রসেসড ফুড, জাঙ্ক ফুড, ফাস্ট ফুড এসব খাওয়া যাবেনা। কারণ এসবে ক্ষতিকর তেল, চর্বি, চিনি ও লবণ থাকে। ক্যাফেইন জাতীয় খাবার যেমন চা, কফি, চকলেট বা কোমল পানীয় যথাসম্ভব এড়িয়ে চলুন। তবে সবচেয়ে জরুরী হল প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ধুমপান এড়িয়ে চলা।

২. ঘুমঃ
গর্ভবতী মায়ের রাতের বেলা ৮ ঘন্টা নিরবচ্ছিন্ন ঘুমের কোনো বিকল্প নেই। এছাড়াও দিনের বেলাতেও দুই এক ঘন্টা বিশ্রাম করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বিছানায় বাম কাত হয়ে শোয়া ভালো।

৩. পরিচ্ছন্নতাঃ
গর্ভকালীন সময়ে মায়েদের প্রতিদিন দুইবার দাঁত ব্রাশ করার পাশাপাশি নিয়মিত সাবান পানিতে গোসল করার কথা বলছেন চিকিৎসকরা। খেয়াল রাখবেন গোসলের স্থান যেন পিচ্ছিল না থাকে। চেষ্টা করুন টুল বা চেয়ারে বসে গোসল সেরে নিতে। পানির গামলা. মগ, কল, সাবান ইত্যাদি হাতের নাগালের মধ্যে রাখবেন যেন ঝুঁকে পড়তে না হয়। পুকুর পাড়ে কিংবা টিউবয়েল চেপে গোসল করতে গেলে আরেকজনের সাহায্য নিন। এছাড়া ত্বকে যেকোনো প্রসাধনী বা এন্টিসেপটিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে নেবেন।

৪. পোশাকঃ
গর্ভবতী মায়েদের এমন পোশাক পরতে হবে যা ঢিলেঢালা, আরামদায়ক, চলাচলে সুবিধাজনক এবং পোষাকটি খুলতে ও পরতে যেন সমস্যা না হয়। তবে কোনো অবস্থায় উঁচু হিল, ফিতাওয়ালা জুতা কিংবা স্লিপ কাটে এমন জুতা পরা যাবেনা। পায়ের মাপ অনুযায়ী আরামদায়ক ফ্ল্যাট জুতা পরুন।

৫. চলাফেরাঃ
চিকিৎসকদের মতে গর্ভকালীন প্রথম ৩ মাস এবং শেষের তিন মাস বেশ সাবধানে চলাচল করতে হয়। শরীর বা মনে বাড়তি চাপ নেয়া যাবেনা। দীর্ঘসময় বসে বা দাঁড়িয়ে না থেকে হাঁটাচলা করুন। এসময় দূরে কোথাও ভ্রমন, বিমান যাত্রা এড়িয়ে চলাই ভালো। এবড়োথেবড়ো রাস্তা, পিচ্ছিল পথে চলাচল কিংবা সিড়ি দিয়ে ওঠানামার সময় সাবধান হতে হবে। কোনো অবস্থাতেই ভারী বস্ত ওঠানামা করবেন না। এসময় অসুস্থ ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে।

৬. চিকিৎসা, টিকা ও ঔষধঃ
আপনি যদি বাচ্চা নেয়ার পরিকল্পনা করেন তাহলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল ইতিহাস জানিয়ে রাখবেন। যেমন আপনি আগে কতবার গর্ভধারণ করেছেন, গর্ভপাত হয়েছিলো কিনা, শিশুর মা-বাবা বা অন্য কারো গুরুতর কোনো অসুস্থতা আছে কিনা সেগুলো খুলে বলতে হবে। তাহলে চিকিৎসক সেই পরিস্থিতি অনুযায়ী টেস্ট, টিকা ও ঔষধ খাওয়ার পরামর্শ দিবেন।

৭. মানসিক স্বাস্থ্যঃ
গর্ভবতী মায়েদের হরমোনে নানা পরিবর্তন আসায় তাদের মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব পড়ে। এসময় তারা শিশুর ভবিষ্যত এবং গর্ভকালীন শারিরিক পরিবর্তন নিয়ে অতিরিক্ত মানসিক আবেগ, চাপ, হীনমন্যতা, দুশ্চিন্তা ও হতাশায় ভোগেন। এক্ষেত্রে অনেক গর্ভবতী নারী ধ্যান বা ধর্মচর্চার মাধ্যমে মনকে স্থির রাখার চেষ্টা করেন। এছাড়া বই পড়ে, ভালো সিনেমা দেখে কিংবা পরিবার-বন্ধুবান্ধবের সাথে হাসিখুশি সময় কাটাতে পারেন। বাড়ি/অফিস কোথাও গর্ভবতী নারীকে কোনো প্রকার অতিরিক্ত কাজ বা মানসিক চাপে রাখা যাবেনা। বরং তাদের প্রতি যত্নশীল হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এছাড়া গর্ভধারণের প্রথম ও শেষের তিন মাস সহবাস থেকে বিরত থাকার
পরামর্শও দিয়েছেন।

৮. শিশুর সাথে যোগাযোগঃ
বিশেষজ্ঞদের মতে গর্ভধারণের কয়েকমাসের মধ্যে শিশু বাইরের জগতের শব্দ শুনতে পায় এবং মায়ের অনুভূতি উপলব্ধি করতে শেখে। তাই এসময় বাবা মা দুজনেরই উচিত হবে শিশুর সাথে কলা বলা, গল্প করা। এসময় চেষ্টা করুন ডিভাইসের ব্যবহার যতোটা কমানো যায়। কারণ এথেকে নির্গত বিকিরণ শিশুর উপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে উচ্চ শব্দযুক্ত পরিবেশ এড়িয়ে চলা জরুরী।

৯. পোষা প্রাণীঃ
আপনার বাড়িতে যদি পোষা প্রাণী থাকে কিংবা বাড়ির আশেপাশে কোন খামার থাকে, তাহলে এসব প্রাণীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে। এ সময় এসব প্রাণীর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলাই ভালো। প্রয়োজনে স্বাস্থ্যসেবা নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।