স্বাস্থ্যই সকল সুখের মুল- প্রাচীনকাল থেকে প্রচলিত এই প্রবাদ বাক্যটি প্রযুক্তির ধাপ পেরিয়ে এখনও ধ্বতই রয়ে গেছে। স্বাস্থ্য যদি ঠিক থাকে তবে জীবনযাত্রাও অনেক সহজ হয়ে ওঠে। কিন্ত স্বাস্থ্য বলতে কি বোঝায়? শুধুমাত্র নিরোহ দেহকেই স্বাস্থ্য বলে না। কর্মক্ষমতা, প্রাণচাঞ্চল্য, মানসিক ভারসাম্য ইত্যাদি হচ্ছে সুস্বাস্থ্যের লক্ষন। কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, চর্বি বা ফ্যাট, ভিটামিন, খনিজ লবণ ও পানি-এই ছয়টি উপাদান আমাদের শরীরের জন্য প্রয়োজনীয়। এর মধ্যে কোনো একটির তারতম্য দেখা দিলেই আমাদের দেখা দেয় স্বাস্থ্য সমস্যা। বর্তমানে ফ্যাাট খাওয়া নিয়ে আমরা সবাই আতংকে ভুগি। খাবারে একটু তেল দেখলেই আঁতকে উঠে বলি, না না খাবো না, ডায়েট করছি। কিন্ত ফ্যাট অর্থাৎ তেল-চর্বি নিয়ে পুষ্টিবিজ্ঞানীরা কি বলে থাকেন তা আমাদের বেশিরভাগেরই জানা নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী আমাদের প্রতিদিন যে পরিমান শক্তি বা ক্যালরি প্রয়োজন তার শতকরা ১৫-৩৩ ভাগ গ্রহন করা উচিত ফ্যাট জাতীয় খাদ্য অর্থাৎ তেল-চর্বি থেকে। এর মানে হল, একজন পুর্ণবয়স্ক মানুষের গড়ে যদি ২৪০০ ক্যালরি শক্তি লাগে তবে তার শতকরা ২৫ ভাগ অর্থাৎ ৬০০ ক্যালরি গ্রহন করতে হবে তেল-চর্বি থেকে। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্বাস্থ্য রক্ষার্থে আপনাকে তেল-চর্বি খেতেই হবে।
ফ্যাট বা তেল চর্বিঃ
তেল হল ফ্যাট বা চর্বিজাতীয় খাদ্য। এতে থাকে গ্লিসারল ও ফ্যাটি এসিডের বিভিন্ন মিশ্রণ। দেহের সার্বিক পুষ্টির জন্য আমাদের তেল চর্বি খেতেই হবে। মনে রাখা প্রয়োজন ১ গ্রাম ফ্যাট থেকে ৯ ক্যালরি শক্তি পাওয়া যায়, যা প্রোটিন বা কার্বোহাইড্রেট থেকে প্রাপ্ত শক্তির প্রায় দ্বিগুণ। আমরা সাধারণত প্রাণীজ ও উদ্ভিজ্জ ‍দুটি উৎস থেকেই ফ্যাট গ্রহন করে থাকি। মাছের তেল একটি উৎকৃষ্ট প্রাণিজ ফ্যাট। আবার অন্যদিকে সয়াবিন তেল, সরিষার তেল, নারিকেল তেল, জলপাই তেল, তিলের তেল, সূর্যমূখী তেল, বাদাম তেল ইত্যাদি উদ্ভিজ্জ ফ্যাট। মোট কথা, সব ধরণের ভোজ্যতেলই হচ্ছে উদ্ভিজ্জ ফ্যাটের উৎস।
কী থাকে তেলেঃ
তেল বা চর্বিতে থাকে ফ্যাটি এসিড ও গ্লিসারল। ফ্যাটি এসিড আসলে কতগুলো কার্বন অনুর চেইন বা শৃঙ্খল। একটি কার্বন অণুর চেইনযুক্ত ফ্যাটি এসিডকে বলা হয় স্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিড, সংক্ষেপে SAFA, যেমন-স্টিয়ারিক এসিড, পামিটিক এসিড ইত্যাদি। একটি কার্বন অণুর চেইন অন্য আরেকটি কার্বন অণুর চেইনে যুক্ত হলে তাকে বলা হয় মনো আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিড। সংক্ষেপে MUFA যেমন-ওলিক এসিড। আর একাধিক কার্বন অণুর চেইনযুক্ত ফ্যাটি এসিডকে বলা হয় পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিড। লিনোলিক ও লিনোলেনিক দুটোই আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিড যা দেহে সংশ্লেষিত হয় না এবং যা দেহের জন্য একান্ত প্রয়োজন। এদেরকে বলা হয় এসেনশিয়াল ফ্যাটি এসিড। প্রতিদিন শিশুদের ৩ গ্রাম, প্রাপ্তবয়স্কদের ৫-৬ গ্রাম, গর্ভবতী মায়েদের ৫-৭ গ্রাম ও স্তন্যদায়ী মায়েদের ৯ গ্রাম এসেনশিয়াল ফ্যাটি এসিড প্রয়োজন। ঘি, মাখন, মাছের তেল ইত্যাদি প্রাণিজ ফ্যাটে অ্যাসেনশিয়াল ফ্যাটি এসিড কম থাকে। তবে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ, ডি ও ক্যালসিয়াম থাকে। অন্যদিকে সব ধরণের উদ্ভিদ বা ভোজ্যতেলে থাকে বিভিন্ন ধরণের অ্যাসেনশিয়াল ফ্যাটি এসিড। আর এ কারণেই প্রাণিজ ফ্যাট থেকে উদ্ভিজ্জ ফ্যাটের গুণগত মান অনেক বেশি।
কেন তেল খাবেন?
প্রত্যেকটি উপাদানের ভালো মন্দ দুটো দিক আছে। তেল খাওয়া নিয়ে আমাদের বাড়াবাড়ি থাকলেও এই সম্পর্কে জানার নেই কোনো আগ্রহ। যদি জানতাম তেল আমাদের কত উপকারে লাগে, তবে সেই অনুযায়ী তেল-চর্বি খাওয়ায়ও অভ্যস্ত হয়ে উঠতাম। তেল থেকে আমাদের শক্তি বা ক্যালরি সংগ্রহ করতে হয়। এছাড়া ফ্যাটে দ্রবীভূত ভিটামিন এ, টি, ই এবং কে আমাদের দেহের বিভিন্ন কাজে লাগে। দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে, শক্তি যোগাতে, দেহের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ স্বাভাবিক সর্বোপরী দেহের গঠন নিয়ন্ত্রণে আমাদের তেল খেতেই হবে।
কতটুকু তেল খাবেন?
প্রতিদিন আমাদের খেতে হবে ৬৬.৬ গ্রাম ফ্যাট বা তেল চর্বি। এর মধ্যে প্রায় ৪০ গ্রাম ফ্যাট আমরা বিভিন্ন খাদ্যশস্য, শাকসবজি ও ফলমুল থেকে পাই। আর বাকি ২৫-২৭ গ্রাম ফ্যাট আমাদের গ্রহণ করতে হয় তেল-চর্বি থেকে। আর এ জন্য আমাদের প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ চা-চামচ তেল খেতে হবে।
কেন তেল কম খাবেন?
অতিরিক্ত ফ্যাট বা তেল চর্বি আমাদের দেহের জন্য কখনোই ভালো নয়। আমাদের রক্তে কোলেস্টেরল নামক এক ধরণের মোম জাতীয় পদার্থ থাকে। বেশি তেল-চর্বি খেলে এই কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যায় এবং রক্তনালীতে একটি পলির মতো স্তর বা আবরণ সৃষ্টি করে। ফলে রক্ত চলাচলে সমস্যা দেখা যায়। রক্তনালী সরু হয়ে যায় এবং এক সময় তা বন্ধ হয়ে যায়। একজন পুর্ণবয়স্ক মানুষের গড়ে যদি ২৪০০ ক্যালরি শক্তি লাগে তাবে তার শতকরা ২৫ ভাগ অর্থাৎ ৬০০ ক্যালরি গ্রহণ করতে হবে তেল-চর্বি থেকে। তাই অরিচ্ছা সত্ত্বেও স্বাস্থ্য রক্ষার্থে আপনাকে তেল-চর্বি খেতেই হবে।
তেলের ভালো-মন্দ
নিয়মিত একই ধরণের তেল না খেয়ে ব্র্যান্ড পরিবর্তন করে খেলে সব তেলই ভালো। যারা হার্টের রোগী তাদের কোলেস্টেরলের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। তাই তাদের স্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিড, যেমন ঘি-মাখনের পরিবর্তে আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিড খেতে হবে। এক্ষেত্রে সরিষার তেলই হচ্ছে উৎকৃষ্ট আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিড। সরিষার তেলের শতকরা ৯০ ভাগই আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিড, যার শতকরা ৯ ভাগই লিনোলেনিক এসিড। পুষ্টিবিজ্ঞানীরা বলেছেন এই লিনোলিনিক এসিড হৃদরোগ প্রতিরোধ করে থাকে। অন্যদিকে লিনোলিক এসিড যা হৃদরোগের আশংকা বাড়ায় তা সরিষার তেলে থাকে শতকরা ১৩ ভাগ। অথচ সানফ্লাওয়ার বা সূর্যমুখী তেলে এটি থাকে সরিষার তেলের ৪ গুণ অর্থাৎ শতকরা ৫২ শতাংশ। কুসুম বীজের তেলে থাকে তা শতকরা ৭৪ ভাগ। সূর্যমুখী তেলে হৃদরোগ প্রতিরোধক লিনোলেনিক এসিড নেই বললেই চলে। অথচ এই সূর্যমুখী তেলই আমরা অনেক দাম দিয়ে কিনে থাকি। মনে রাখবেন, সুস্থ-অসুস্থ যে কেউই সরিষার তেল নিশ্চিন্তে খেতে পারেন। রান্নায় কিংবা সালাদ কিংবা ভর্তায় মিলিয়ে প্রতিদিন ৫-১০ চামচ সরিষার তেল অনায়াসেই খাওয়া যায়।
পুষ্টিবিজ্ঞানীরা বলে থাকেন, মিলিয়ে-মিশিয়ে তেল খেতে হবে। স্যাচুরেটেড বা আনস্যাটুরেটেড তেল মিশিয়ে খেতে হবে। ১ঃ১ঃ১ অনুপাতে আপনাকে তেল খেতে হবে। যেমন- ১ লিটার স্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিড যেমন, ঘি, মাখ, পাম তেল ইত্যাদি, ১ লিটার মনো আনস্যাচুরেটেডফ্যাটি এসিড যেমন, সরিষার তেল, তিলের তেল, বাদাম তেল ইত্যাদি এবং ১ লিটার পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিড যেমন সয়াবিন তেল ইত্যাদি। তবে পুষ্টি বিজ্ঞানীয় খাদ্য তালিকায় সরিষার তেলকে সর্বাধিক প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।
তেল খাওয়ার ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। না বুঝে তেল খাওয়া ছেড়ে দেয়া মানেই নিজের শারীরিক কাঠামোকে ভেঙ্গে ফেলা। তেল খাবো, কতটুকু খাবো, কোন তেল খেলে উপকার হবে, কোন তেলে ক্ষতি হবে না-তেল খাওয়ার ব্যাপারে এই বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিতে হবে।

লেখক-
ডাঃ আওরঙ্গজেব আরু

সম্পূর্ণ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কাঠের ঘানিতে ভাঙ্গা সরিষার তেল কিনতে কমেন্টস বক্সে তেলের পরিমাণ, আপনার যোগাযোগ নাম্বার ও ঠিকানা দিয়ে সহযোগিতা করবেন।